জোহরানকে ঘায়েল করতে ‘মুসলিম’ পরিচয় সামনে আনছেন বিরোধীরা, কীভাবে জবাব দিচ্ছেন তিনি
জোহরানকে ঘায়েল করতে ‘মুসলিম’ পরিচয় সামনে আনছেন বিরোধীরা, কীভাবে জবাব দিচ্ছেন তিনি
নিউইয়র্কের রাজনৈতিক আকাশে এক নতুন ঝড় উঠেছে। এই বিশ্বের সবচেয়ে প্রভাবশালী শহরের মেয়র নির্বাচনের ময়দানে ডেমোক্র্যাটিক পার্টির উজ্জ্বল তারকা জোহরান মামদানির নামটি আজ সকলের জিভে। কিন্তু এই নির্বাচনের শেষ ধাপে, যখন বিজয়ের আলো দেখা দিতে শুরু করেছে, তখনই তার বিরোধীরা তার ‘মুসলিম’ পরিচয়কে অস্ত্র করে তাকে আঘাত করার চেষ্টা শুরু করেছে। ইসলামভীতির বিষাক্ত তীর ছুড়ে তারা চায় জোহরানকে ঘায়েল করতে, কিন্তু জোহরান? তিনি শুধু ঘায়েল হয়ে থাকেননি; বরং সেই আঘাতকে তার শক্তির উৎসে পরিণত করেছেন। তার জবাব শুধু ব্যক্তিগত নয়, এটি একটি সমগ্র সম্প্রদায়ের মর্যাদা রক্ষার লড়াইয়ের ঘোষণা। আজ এই লেখায় আমরা জোহরানের এই অসাধারণ যাত্রা, তার বিরোধীদের কূটকৌশল এবং তার সাহসী প্রতিরোধের গল্প তুলে ধরব। এটি শুধু একজন রাজনীতিবিদের গল্প নয়, বরং সহনশীলতা, ন্যায়বিচার এবং পরিচয়ের লড়াইয়ের এক মহাকাব্য।
জোহরান মামদানি: এক মুসলিম যুবকের অসাধারণ উত্থান
জোহরান মামদানির জন্ম হয়েছে ১৯৯১ সালে, নিউইয়র্কের হারলেমে। তার বাবা-মা উগান্ডা থেকে অভিবাসী হয়ে এসেছিলেন, যেখানে তারা মুসলিম পরিবারের অংশ ছিলেন। ছোটবেলা থেকেই জোহরানের জীবন ছিল সংগ্রামের। কলেজে পড়াশোনার সময় তিনি শ্রমিক অধিকারের জন্য লড়াই শুরু করেন, এবং পরবর্তীকালে নিউইয়র্ক স্টেট অ্যাসেম্বলির সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হন। ২০২৫ সালের নিউইয়র্ক সিটি মেয়র নির্বাচনে তিনি ডেমোক্র্যাটিক প্রাইমারিতে শীর্ষে উঠে এসেছেন। তার প্রচারণার মূলমন্ত্র? "ন্যায়বিচার সবার জন্য"। তিনি হাউজিং সংকট, শিক্ষা ব্যবস্থার অসমতা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের মতো ইস্যুতে জনগণের পাশে দাঁড়িয়েছেন। কিন্তু তার মুসলিম পরিচয়টি, যা তিনি গর্বের সঙ্গে বহন করেন, হঠাৎ তার বিরুদ্ধে অস্ত্র হয়ে উঠেছে।
নির্বাচনের প্রথম দিকে তার প্রচারণা ছিল মসৃণ। জোহরানের বক্তৃতায় ছিল আশার আলো—যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বৈচিত্র্যময় শহর নিউইয়র্ককে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক করার স্বপ্ন। কিন্তু অক্টোবর মাসের শেষভাগে, যখন ভোটাররা তার দিকে ঝুঁকতে শুরু করেছে, তখন প্রতিপক্ষের আক্রমণ শুরু হয়েছে। ফক্স নিউজের মতো ডানপন্থী মিডিয়া চ্যানেলগুলো তার পুরনো জীবনী নিয়ে খোঁজখবর চালিয়েছে। তারা দাবি করেছে যে জোহরান কলেজে অ্যাফারমেটিভ অ্যাকশনের সুবিধা নিতে তার জাতিগত পরিচয় নিয়ে মিথ্যা বলেছিলেন। আরও এগিয়ে, তারা তার মুসলিম বিশ্বাসকে ‘আন্তর্জাতিক ঘৃণার উৎস’ বলে চিত্রিত করেছে। এই আক্রমণগুলো শুধু রাজনৈতিক নয়, এগুলো ইসলামভীতির বিষাক্ত রূপ। নিউইয়র্কে প্রায় ১০ লাখ মুসলমান বাস করে, এবং এই আক্রমণগুলো তাদের মর্যাদাকেও লক্ষ্য করে। বিরোধীরা বুঝতে পারেনি, এই আঘাত জোহরানকে দুর্বল করবে না; বরং তাকে আরও শক্তিশালী করবে।
বিরোধীদের কূটকৌশল: মুসলিম পরিচয়কে অস্ত্র করে আঘাত
নির্বাচনী রাজনীতিতে পরিচয়ের খেলা নতুন নয়, কিন্তু জোহরানের ক্ষেত্রে এটি বিশেষভাবে কটু। তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বীরা—যারা রিপাবলিকান এবং কনজারভেটিভ গ্রুপের সঙ্গে যুক্ত—তার মুসলিম পরিচয়কে সামনে এনে তাকে ‘বিদেশী’ বা ‘অন্য’ বলে চিত্রিত করার চেষ্টা করছে। ফক্স নিউজের একটি প্রোগ্রামে উপস্থাপক চার্লি হার্ট জোহরানকে ‘বর্ণবাদী’ বলে অভিহিত করেছেন, দাবি করে যে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের মূল্যবোধের বিরোধী। নিউইয়র্ক টাইমসের একটি প্রতিবেদনকে ভিত্তি করে তারা তার কলেজ জীবনের গল্প বিকৃত করেছে। এই আক্রমণগুলোর উদ্দেশ্য স্পষ্ট: মুসলিম ভোটারদের মধ্যে ভয় সৃষ্টি করা এবং সাদা, খ্রিস্টান ভোটারদের মধ্যে সন্দেহ জাগানো।
এটি শুধু মিডিয়ার খেলা নয়। সোশ্যাল মিডিয়ায় ট্রল আর্মি সক্রিয় হয়েছে। #ZohranTheThreat-এর মতো হ্যাশট্যাগ ছড়িয়ে তারা তার ধর্মীয় পরিচয়কে ইসলামিক এক্সট্রিমিজমের সঙ্গে যুক্ত করার চেষ্টা করছে। এমনকি তার ফিলিস্তিনপন্থী অবস্থানকে—যা তিনি ন্যায়বিচারের দৃষ্টিকোণ থেকে সমর্থন করেন—তারা ‘আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র’ বলে চিত্রিত করছে। এই কৌশলের ফল? নির্বাচনী জরিপে তার সমর্থন কিছুটা কমেছে, বিশেষ করে উপনগরীয় এলাকায়। কিন্তু জোহরানের বিরোধীরা ভুল করেছে। তারা ভাবছে, একজন মুসলিমকে আঘাত করলে সে হার মানবে। কিন্তু জোহরানের জবাব দেখে তারা বুঝতে পারবে না যে, ইসলামের শিক্ষা হলো সহ্যশক্তি এবং প্রতিরোধের শক্তি।
জোহরানের জবাব: আবেগ, সাহস এবং ঐক্যের ডাক
শুক্রবার, ২৪ অক্টোবর, ২০২৫—এই দিনটি জোহরানের জীবনের একটি টার্নিং পয়েন্ট। ব্রঙ্কস ইসলামিক কালচারাল সেন্টার মসজিদের সামনে দাঁড়িয়ে তিনি একটি আবেগঘন বক্তব্য দেন। তার চোখে জল, কিন্তু কণ্ঠস্বরে অটল দৃঢ়তা। "আমার প্রতিদ্বন্দ্বীরা নির্বাচনের শেষ মুহূর্তে ঘৃণা এবং ইসলামভীতি ছড়াচ্ছে," তিনি বলেন। "এটি শুধু আমাকে আঘাত করে না; এটি নিউইয়র্কের প্রায় দশ লাখ মুসলমানের মর্যাদাকে লক্ষ্য করে। কিন্তু পার্থক্য এখানে: আমরা কতটা অপমান সহ্য করতে রাজি। আমি সহ্য করব না।" এই বক্তব্যটি সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয়ে যায়, এবং তার সমর্থকদের সংখ্যা বাড়তে থাকে।
জোহরানের জবাব শুধু কথায় নয়, কর্মে। তিনি তার প্রচারণাকে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক করেছেন। ইহুদি, খ্রিস্টান, হিন্দু এবং অন্যান্য সম্প্রদায়ের নেতাদের সঙ্গে জোট গড়ে তুলেছেন। উল্লেখযোগ্য যে, নিউইয়র্কের কয়েকজন ইহুদি র্যাবাই (যাজক) তার সমর্থনে এসেছেন। তারা বলছেন, "জোহরানের লড়াই সবার অধিকারের লড়াই। আমরা গণতন্ত্র এবং সমানতার বিশ্বাসী।" ব্র্যাড ল্যান্ডারের মতো ইহুদি নেতা, যিনি প্রাইমারিতে তৃতীয় হয়েছিলেন, জোহরানকে 'বন্ধু' বলে তার প্রচারণায় যোগ দিয়েছেন। এই ঐক্যের মাধ্যমে জোহরান দেখাচ্ছেন যে, তার মুসলিম পরিচয় বিভাজনের নয়, বরং সেতুবন্ধনের।
তার আরেকটি কৌশল হলো যুব সম্প্রদায়কে জাগিয়ে তোলা। সোশ্যাল মিডিয়ায় তিনি লাইভ সেশনে তার ব্যক্তিগত গল্প শেয়ার করছেন—কীভাবে তিনি মসজিদে নামাজ পড়ে শান্তি খুঁজে পান, কীভাবে ইসলাম তাকে ন্যায়বিচারের পথ দেখায়। "আমার ধর্ম আমাকে শিখিয়েছে যে, অত্যাচারের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে হয়," তিনি বলেন। এই গল্পগুলো মুসলিম যুবকদের মধ্যে অনুরণিত হচ্ছে, এবং তারা তার প্রচারণায় স্বেচ্ছাসেবক হয়ে আসছেন। ফলে, তার ভোটার বেস শুধু মুসলিমদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি বৈচিত্র্যময় হয়ে উঠেছে।
এর প্রভাব: নিউইয়র্কের রাজনীতিতে এক নতুন অধ্যায়
জোহরানের এই প্রতিরোধ নিউইয়র্কের রাজনীতিতে এক নতুন দিগন্ত খুলে দিয়েছে। তার সমর্থন বাড়ছে, বিশেষ করে যুবক এবং সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মধ্যে। জরিপ অনুসারে, তার ভোটের সম্ভাবনা ৪৫% ছাড়িয়ে গেছে। কিন্তু এর চেয়ে বড় প্রভাব হলো সামাজিক। এই লড়াই ইসলামভীতির বিরুদ্ধে একটি জাতীয় আন্দোলনের সূচনা করেছে। হাসান মিনহাজের মতো কমেডিয়ানরা তার পক্ষে স্ট্যান্ডআপ করছেন, এবং আয়েশা কুরমানির মতো অ্যাকটিভিস্টরা তার সঙ্গে রাস্তায় নেমে এসেছেন। এটি দেখাচ্ছে যে, যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে পরিচয় আর বিভাজনের হাতিয়ার নয়; এটি শক্তির উৎস।
জোহরানের গল্প আমাদের শেখায় যে, অত্যাচারের মুখে নীরবতা নয়, প্রতিরোধই উত্তর। তার মতো যুবকরা, যারা তাদের পরিচয়কে গর্বের সঙ্গে বহন করে, তারাই ভবিষ্যত গড়বে। নভেম্বরের নির্বাচনে তিনি জিতুক বা না জিতুক, তার এই লড়াই ইতিহাসে অমলিন থাকবে। কারণ, এটি শুধু একজন মানুষের লড়াই নয়; এটি সকল সংখ্যালঘুর অধিকারের লড়াই।
আশার আলোয় এক নতুন নিউইয়র্ক
জোহরান মামদানির যাত্রা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, ঘৃণার অন্ধকারে আলো জ্বালানো যায় সাহস দিয়ে। তার বিরোধীরা তার মুসলিম পরিচয়কে ঘায়েল করতে চেয়েছে, কিন্তু তিনি সেই পরিচয়কে তার সবচেয়ে বড় অস্ত্র বানিয়েছেন। তার জবাবে রয়েছে আবেগ, ঐক্য এবং অটল বিশ্বাস। নিউইয়র্কের রাস্তায়, মসজিদের সামনে, সোশ্যাল মিডিয়ায়—তার কণ্ঠস্বর অনুরণিত হচ্ছে: "আমরা ভয় পাব না, আমরা লড়ব।" এই লড়াই শুধু তার নয়; এটি আমাদের সকলের। যদি আমরা সকলে এই ঐক্যের হাত ধরি, তাহলে একদিন নিউইয়র্ক—এবং বিশ্ব—সত্যিকারের অন্তর্ভুক্তিময় হয়ে উঠবে। জোহরানের মতো যোদ্ধাদের জয় হোক, এবং ঘৃণার পরাজয় হোক। আল্লাহ তাকে শক্তি দিন, এবং আমাদের সকলকে সহনশীলতার পথ দেখান।
No comments